এর দ্বারা পোস্ট করা
Mohammad Ali
এই তারিখে
Blogging
Content marketing
Digital strategy
SEO
Video marketing
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
ইতিহাস মাঝে মাঝে এমনভাবে বাঁক নেয়, যা রূপকথাকেও হার মানায়। বাংলাদেশের ইতিহাস বারবার সেই সত্যের সাক্ষী হয়েছে। বাঙালি যে বীরের জাতি, সেই পরিচয় নতুন করে বিশ্বকে দেখিয়ে দিল ২০২৪ সাল—দীর্ঘ ১৫ বছরের এক ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারের পতনের মধ্য দিয়ে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাস তাই শুধু একটি ক্যালেন্ডারের পাতা নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা গণজাগরণের মহাকাব্য। যার সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে কিছু বিক্ষুব্ধ ছাত্রের স্লোগান দিয়ে, কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তা পরিণত হয়েছিল এক অপ্রতিরোধ্য গণ-অভ্যুত্থানে। এই অভ্যুত্থানের ভয়াল সুনামিতে ভেসে গিয়েছিল টানা ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আপাতদৃষ্টিতে অজেয় এক সরকার। এটি কেবল একটি সরকারের পতনই নয়, বরং একটি জাতির আত্ম-উদ্বোধনের প্রতীক। এটি কেবল একটি সরকারের পতন ছিল না; এটি ছিল গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার আর ভবিষ্যতের মুক্তির জন্য একটি নিরস্ত্র জাতির সম্মিলিত গর্জন।
যেকোনো মহাবিস্ফোরণের পেছনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অসন্তোষের বারুদ থাকে। ২০২৪ সালের এই গণ-অভ্যুত্থানও এর ব্যতিক্রম ছিল না। এর প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য কয়েকটি বিষয় জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে মেধার তুলনায় কোটার প্রভাব বহু বছর ধরেই বেশি ছিল। মুক্তিযোদ্ধা কোটা (৩০%), নারী কোটা (১০%), জেলা কোটা (১০%), ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী (৫%) এবং প্রতিবন্ধী (১%) মিলিয়ে মোট ৫৬% পদ কোটার জন্য সংরক্ষিত ছিল। সাধারণ মেধাবী শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর ধরে এই ব্যবস্থাকে "মেধা হত্যাকারী" হিসেবে চিহ্নিত করে আসছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, এই ব্যবস্থার কারণে যোগ্য প্রার্থীরা চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং প্রশাসনে অদক্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২০১৮ সালে একই দাবিতে শিক্ষার্থীরা একবার রাজপথে আন্দোলন করেছিল। সেই আন্দোলনের চাপের কারণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দেন। শিক্ষার্থীরা বিজয় মিছিল করে ঘরে ফিরে গেলেও কিছুদিন পর একটি পরিপত্রের মাধ্যমে কেবল ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেডে কোটা বাতিল করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা ছিল। এই বঞ্চনার ক্ষত তাদের মনে দগদগে ঘা হয়ে রয়ে গিয়েছিল।
২০২৪ সালের ৫ জুন, হাইকোর্ট ২০১৮ সালের সেই পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণা করে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালের রায় প্রদান করে। এই রায়টি ছিল ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিতে অগ্নিসংযোগের মতো। শিক্ষার্থীরা অনুভব করে, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আবারও খেলা শুরু হয়েছে। এই একটি রায়ই দেশজুড়ে ছাত্রসমাজকে চূড়ান্তভাবে বিক্ষুব্ধ করে তোলে এবং আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দেয়।
কোটা আন্দোলন ছিল কেবল একটি উপলক্ষ্য। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের জমে থাকা ক্ষোভ। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের অভাবের অভিযোগ ছিল স্পষ্ট। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচন জনগণের ভোটাধিকারকে হরণ করেছিল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো দমনমূলক আইন দ্বারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করা হয়েছিল। বিরোধী দলকে দমন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ব্যাপক দুর্নীতি সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল লাগামহীন দ্রব্যমূল্য, অর্থনৈতিক সংকট এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানের অবনতি। যখন ছাত্ররা রাজপথে নামে, তখন সাধারণ জনগণ তাদের মাঝে নিজেদের মুক্তির প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়।
ঢাকার রাজপথে 'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন'-এর স্লোগান দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
এই আন্দোলন ধাপে ধাপে তার প্রকৃতি পরিবর্তন করেছে। প্রতিটি আঘাত একে আরও শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে।
আন্দোলনের শুরু ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন, ক্লাস বর্জন এবং বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। তাদের স্লোগান ছিল একটাই: "বৈষম্যের কোটা, মানি না মানব না।"
কিন্তু সরকার এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে দমন করার জন্য শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নেয়। জুলাই মাসের মাঝামাঝি (বিশেষ করে ১৫-১৯ জুলাই) পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন 'ছাত্রলীগ' আন্দোলনকারীদের ওপর নারকীয় হামলা চালায়। লাঠি, টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট এমনকি সরাসরি গুলি চালানো হয়। ঢাকা পরিণত হয় এক রণক্ষেত্রে। শত শত শিক্ষার্থী আহত হয়, এবং বেশ কয়েকজন তরুণ প্রাণ হারায়। সরকার ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দিয়ে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে খবর চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে।
এই দমনপীড়নকে আরও উস্কে দেয় প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তব্য। জাতীয় সংসদে তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের 'রাজাকারের বাচ্চা' হিসেবে উল্লেখ করেন। এই অপমানজনক মন্তব্যটি শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, বরং পুরো জাতিকেও অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ করে তোলে।
এই নৃশংস দমনপীড়ন আন্দোলনকে নিভিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কোটা সংস্কারের নিরীহ দাবি সরকার পতনের এক দফা দাবিতে রূপান্তরিত হয়। শিক্ষার্থীদের রক্তে ভেজা রাজপথে তখন নতুন স্লোগান শোনা যেতে থাকে:
"এক দফা এক দাবি, স্বৈরাচার তুই কবে যাবি?"
"আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে?"
আন্দোলন তখন আর শুধুমাত্র ছাত্রদের ছিল না। সন্তানের রক্ত দেখে অভিভাবকরা, সাধারণ শ্রমিক, দিনমজুর, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী—সবাই রাজপথে নেমে আসে। এটি পরিণত হয় এক সর্বাত্মক ছাত্র-জনতার আন্দোলনে।
আগস্টের শুরুটা ছিল ঝড়ের পূর্বাভাস। আন্দোলনকারীরা বুঝতে পেরেছিল, এই সরকারকে আলোচনার টেবিলে আনা সম্ভব নয়। তাই তারা বেছে নেয় ইতিহাসের পরীক্ষিত একটি অস্ত্র—অসহযোগ।
জুলাইয়ের শেষে 'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন'-এর পক্ষ থেকে দেশব্যাপী সর্বাত্মক 'অসহযোগ আন্দোলন'-এর ডাক দেওয়া হয়। জনগণকে সরকারের সকল প্রকার কর প্রদান বন্ধ, অফিস-আদালত বর্জন এবং সকল পরিবহন ব্যবস্থা অবরোধ করার আহ্বান জানানো হয়। এই ডাকে অভূতপূর্ব সাড়া মেলে। দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসন কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
৩ আগস্ট 'চলো চলো ঢাকা চলো' কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলনের চূড়ান্ত আঘাত হানার আহ্বান জানানো হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লাখ লাখ মানুষ পায়ে হেঁটে, ট্রাকে, অথবা অন্যান্য বাহনে চড়ে ঢাকার দিকে যাত্রা শুরু করে। ৪ আগস্ট রাজধানী ঢাকা এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রথমে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করলেও ছাত্র-জনতার সম্মিলিত স্রোতের সামনে তারা অসহায় হয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে পিছু হটে যায়। সেদিন রাষ্ট্রের দমন করার ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছিল।
৫ আগস্ট ছিল একটি ঐতিহাসিক দিন। আগের রাত থেকেই সারা দেশে উত্তেজনা ছিল চরমে। ছাত্র-জনতা ঢাকার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। রাষ্ট্রের সকল স্তম্ভ যখন একে একে ভেঙে পড়ছে, তখন সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়, যা সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। উপায়ন্তর না দেখে, ৫ আগস্ট বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং একটি সামরিক হেলিকপ্টারে দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন।
তার পদত্যাগের ঘোষণার সাথে সাথে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে বাঁধভাঙা উল্লাস। দীর্ঘ ১৫ বছরের এক শাসনের অবসান ঘটে ছাত্র-জনতার সম্মিলিত শক্তির কাছে।
৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর ঢাকার শাহবাগে ছাত্র-জনতার বিজয় উল্লাস।
একটি শাসনের পতনের পর দেশ একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে, যেখানে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই বিদ্যমান।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন: দেশে সাংবিধানিক শূন্যতা এড়াতে এবং গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ সুগম করতে সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এই সরকারের প্রধান কাজ হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করা।
মুক্তি ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি: নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন দমনমূলক আইন বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করে। বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের সংস্কার করে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ: এই অভ্যুত্থান একটি নতুন সূর্যোদয়ের সূচনা করলেও সামনে যে পথ রয়েছে তা সহজ নয়। ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক সমাজ গঠন করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
উত্তর: আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে। কিন্তু সরকারের সহিংস দমনপীড়ন এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের কারণে এটি দ্রুত সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে রূপ নেয়।
উত্তর: শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলে পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন।
উত্তর: নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়েছে।
উত্তর: কারণ এটি শুধুমাত্র ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের সাধারণ জনগণ, শ্রমিক, পেশাজীবীসহ সকল স্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে এটিকে একটি গণজাগরণে পরিণত করেছে, যার ফলে একটি শক্তিশালী সরকারের পতন ঘটে।
উত্তর: বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আন্দোলনে কয়েকশত মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। তবে এর সঠিক ও চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণের কাজ চলছে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং এটি একটি প্রজন্মের জাগরণের প্রতীক। এটি প্রমাণ করেছে যে, কোনো স্বৈরাচারী শক্তি জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার ঊর্ধ্বে নয়। বুলেট, টিয়ার গ্যাস অথবা ইন্টারনেট বন্ধ করে জনতার কণ্ঠকে স্তব্ধ করা সম্ভব নয়। শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই পরিবর্তন বাংলাদেশকে কোন পথে নিয়ে যাবে, তা সময়ই নির্ধারণ করবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, এই অভ্যুত্থান আগামী প্রজন্মের জন্য গণতন্ত্র ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে একটি চিরস্থায়ী অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
এই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে আপনার চিন্তা বা মতামত কী? নিচের মন্তব্য বক্সে আমাদের সাথে শেয়ার করুন। আপনার প্রতিটি মন্তব্য আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
Read English
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত লিখুন। দয়া করে শালীন ভাষায় মন্তব্য করুন।